হারকিউলিস ক্যপটেন
====================================
বাঁটুল মহাকালী উচ্চ বিদ্যালয় লেখা একটা ব্যজ হাতে পেলাম। বুকের মধ্যে সাথে সাথে আটকে নিলাম। সেই প্রথম ইস্কুলের ব্যজ কেমন হয় দেখলাম। একটা ৫ টাকা দামের ব্যজ যে কি পরিমান আবেগ তৈরী করতে পারে সেদিন বুঝেছিলাম।
আমাদের ক্লাস হতো পুরোনো বিল্ডিং এর নিচের দিকের কোণের ঘরে। এই বিল্ডিং টাকে নিছক মজা করে বন্ধুরা রেল কলোনি বলত। তার কারণ আমাদের ইস্কুল বাড়ির রঙটি ছিল নস্যি রঙের। সামনে ঝাউ আর দেবদারুর সার সার সজানো বাগান আর তারাই ফাঁক দিয়ে উপরে নীল রঙের বোর্ড এ বড়ো বড়ো করে লেখা আমাদের স্কুলের নাম।
নিরঞ্জন দা ঘন্টা বাজালেন, মানে একটু পরেই আসবেন আমাদের দুপুরের নায়ক রবিনসন ক্রুসো, স্যর প্রশান্ত চন্দ্র, অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে অফিস ঘর থেকে বের হতেন। হাতে একটি জীব-বিদ্যার বই, চক ডাস্টার আর হ্যমলিনের বাঁশি। মাঝে মাঝে ক্লাসে বেয়াদবি করলেই সে বাঁশি বেজে উঠত।
আমরা ইস্কুলের যে ঘরটিতে ক্লাস করতাম সেটি একদম ভিতরে এবং কোণের দিকের শেষ ঘর। বড়ো বড়ো জানলা দিয়ে দেখা যায় বাঁশ বোন, বেত ঝাড়, বনকলমি লতা আর পানায় ভরে থাকা বুনো পুকুর।
দুপুরের প্রচণ্ড গরমে এই জানলাই হতো আরাম বাতাসের ঠিকানা, আর বৃষ্টিতে অদ্ভুত সুন্দর লাগত এই পুরোনো ঘরের বর্ষা। মুষলধারা ...
আমার ক্লাস সেভেন। বুক লিস্ট দেওয়া হয়েছে সদ্য। অনন্তের হওয়ায় তখন আরো কয়েকজনের মতো গলদঘর্ম হচ্ছি আমিও।
তারই মাঝে হই হই, টেবিল বাজিয়ে গান, টিফিনের হুইলের ফুচকা আর খোলা মাঠে ফুটবল।
ক্লাস সেভেন হবার পর প্রথম দিন। কয়েকটা ক্লাস চললো, টিফিনে লাইব্রেরিতে গেলাম কিছু বইয়ের কালেকশন এ। মৌলবি স্যর আমাকে বেশ পছন্দ করতেন, মাঝে মাঝে জর্দা পান না খাওয়ার ধমক দিতাম তাই একটা স্নেহ ছিল ওঁর, আর বই সময়ে ফেরত দিতাম বলে দুটো বই ইস্যু করেও দিয়েছেন অনেক সময়। ভুগোল বই সঞ্জীব বাবু কোনোদিনই কিনতে দিতেন না। তাই পড়াশোনায় খুউব বেশি অসুবিধা হত না।
এমনই এক বিকেল। পুরোনো ফ্যনের ঘড়ঘড় শব্দ আর ৪:১০ এর ক্লাসঘর। তখন বিকেল।
সালোকসংশ্লেষের বিশ্লেষণ করছেন এক শান্ত ধীর বিশ্লেষক। সাদা চেক জামা, একটা সাদা ফ্লেজ টাইটান ঘড়ি ..
অজান্তেই কখন প্রশ্ন করলেন আমায়! নাহ্ সেদিন তিনি আর কিছু বলেন নি। নিছক ভ্রু কুঁচকে ফিরেছিলেন ৪৬ পৃষ্ঠায়।
কিছুদিন পরে একদিন টিফিনের সময় এমনিই ঘুরে বেড়াচ্ছি, উপরের অফিস ঘর থেকে আমাকে ডাক দিলেন ; ভটচায্ অফিসে আয় একবার। ভয়ে ভয়ে উপরে গেলাম। কিছু ভুল করে ফেললাম নাকি! এতো কিছু ভাবার সময়ই দিলেন না। হাতে একটা জীবন বিজ্ঞানের বই দিয়ে পরিজনের মতোই আন্তরিক ও মার্জিত ভঙ্গিতে পিঠে একটা হাত রেখে বললেন মন দিয়ে পড়িস!
দিনান্তের শেষ ছায়া তখনও হাতছানি দিচ্ছে গোধূলি কে। একটা অহংকার হীন মানুষ, একজন স্বপ্ন গড়ার কারিগর; নিশ্বব্দে বেরিয়ে যাচ্ছেন তাঁর কালো রঙের সাইড ব্যগ আর লাল রঙের হারকিউলিস ক্যপটেন সাইকেলে চড়ে .....
---------------
চিত্রঋণ - Ajanta Ma'am
ছবিতে - মাননীয় প্রশান্ত চন্দ্র স্যর
( বাঁটুল মহাকালী উচ্চ বিদ্যালয়)
0 Comments