আমার প্রথম লাইব্রেরিয়ান ||
“ ভটচাজ দুপুরে চলে এসো, কিছু নতুন বই এসেছে। দেখে যেও। ভল্টে দা তো বলেছে সৌম্য এলে আজকে চা খাওয়াবে "
হ্যা, এমন অনেক স্মৃতিমেদুর গল্প আছে তাঁকে ঘিরে। মুগকল্যান পল্লী ভারতী লাইব্রেরি'র একজন সক্রিয় লাইব্রেরিয়ান ছিলেন আমাদের প্রিয় তপন কুমার গুড়িয়া। একলা থাকা একটা প্রাণোচ্ছল মানুষ, ছোটো-ছোটো ছেলে মেয়ে দের অনাবিল বই মুখো করা একজন নিখাদ ভালোমানুষ।
কাছ থেকে দেখেছি, টেবিল বাজিয়ে গান করেছি, দেওয়াল পত্রিকা লিখবো বলে কাগজ কিনতে যাওয়া, কে লিখবে সেই দেওয়াল পত্রিকা তারজন্য ছুটদৌড়, এসবের নেপথ্যে একজনই বিরাজমান পল্লবী ভারতী লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান তপন কাকু। আজ সেই মানুষটাকে হঠাৎ মনে পড়লো। তাঁর কিছু প্রিয় সময় এখানে রাখা থাক। আমার মতো করে। আপনিও যদি সে সময়ের সমসাময়িক হন তাহলে আর কি এক খিলি চোখ ভেজান।
ঝড়বৃষ্টির বিকেল সেদিন। প্রথম প্রেম টা ভেঙেছে সেদিন। প্রচণ্ড ডিপ্রেসড লাগছে সেদিন। একলা। কাউকে কিছু বলতে না পারার একটা চাপা কষ্ট, সব মিলিয়ে প্রায় ফুরিয়ে এসেছি আমি।
বন্ধু সনতের মুখে অনেকবার লাইব্রেরিটির গল্প শুনেছি। বাগনানে মুগকল্যান গ্রামে এতো পুরোনো ( প্রায় ১২৫ বছর) লাইব্রেরি আছে, তা আমি জানতামই না। আর জানলেও যাইনি কখনো।
দূর্গা পুজোর আগের সময় টা ২০১৫, সে বছর আমায় একটি কবিতা লেখার অনুরোধ এলো দেওয়াল ম্যগজিনে।
বাগনান শহরে সাহিত্যের রসদ, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক অনেক আছেন তাঁরাই হয়তো আমার অনুপ্রেরণা। যাইহোক কথায় ফিরি।
আমি কবিতা লিখবো বলে প্রথম সে লাইব্রেরি মুখো হই। কবিতা জমা দিতে। এর আগে বহুবার লাইব্রেরির সদস্য হতে চেয়েছিলাম কিন্তু বাধসাধে এক্সকিউজ। পরে অবস্য দুপুর মানেই একঝাঁক হলদে হয়েযাওয়া পাতার করিডোরে পাশাপাশি এক ধূসর গন্ধ নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছি ...
দুপুরে কাকুর ফোন এলো, ভটচায আজ চলে এসো তাড়াতাড়ি, ভল্টেকাকু আজ চা খাওয়াবে। আমি লাইব্রেরি আসতাম। প্রতিদিন আসতাম। তারপর সন্ধেবেলা বই নিয়ে টিউশনি পড়াতে চলে যেতাম। কিন্তু যতটুকু থাকতাম ততটুকু সময় বেশ কাটতো বই আর চা আড্ডায়।
পল্লিভারতী লাইব্রেরি | তপন কুমার গুড়িয়া
বৃষ্টিদিনের কথা বলার কারণ এই লাইব্রেরির পথেই আমি তাকে দেখতে পেতাম। সে গান শিখতে চলে যেত সাইকেল নিয়ে পাশের পাড়ায়, আমি হাঁ করে বসে থাকতাম রাস্তার দিকে তাকিয়ে, লাইব্রেরির বারান্দা থেকে ওকে আর রাস্তাটা পরিস্কার দেখা যেত।
একদিন এমনই এক ঝড়জলের বিকেল আমি সেই রাস্তার দিকে হাঁকরে তাকিয়ে আছি। তার দেখা নেই। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বসে থাকার পর পাশ ফিরে উঠতে যাবো হঠাৎ কাকুর হাত টা কাঁধে এসে পড়লো। কাঁধটা ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন
- ভটচায মেম সাহেব পড়েছো?
- আমি বললাম নাতো।
-পড়ো, ভালোলাগবে। মন খারাপ করবেনা।
তারপর তিনি একটি ঝোলা ব্যগ কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
আমি সামান্য চুপ করে থেকে হাঁকরে চেয়ে রইলাম মানুষটার দিকে।
শেষবার দেখেছিলাম গতবারের দূর্গা পুজোতে। দুপুরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলাম বাইকে, লাইব্রেরির রাস্তাই ছিলো সেদিনো, আমার সফরের শুরুটা। দেখেছিলাম সেই দীপ্তিময় মানুষটাকে শেষ বারের মতো। সেই একগাল হাসি হেসে বলেছিলে নাও একটা টফি খাও, মিষ্টি টফি মন ভালো করেদেয়। কে জানে তিনি তখনো কি করে বুঝেছিলেন আমার মন খারাপের কথা। মৃদু হেসে আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম গন্তব্যের দিকে।
নম্বর গুলো ইমোশনের ডায়েরিতে রেখেদিলাম। আর ফোন করবোনা। আসবেওনা। জীবনের সফর টা বড়ো অদ্ভুত, তুমি আমি হাসছি, কাঁদছি, চা খাচ্ছি, আরো কতো কি।
অথচ হেমন্তের বিকেল কিম্বা বর্ষা ছাতায় নিজে ভিজে বই বাঁচিয়ে সাইকেলে জোরে জোরে প্যডেল করার অর্থ কিছুই ছিলো না। তবে যা ছিলো তা দুপুরের লাইব্রেরির বারান্দা আর সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবি পরা লাইব্রেরিয়ান জানতেন।
কাকু! আপনাকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি করার কথাছিলো, রাখলেন না। তারআগেই পালিয়ে গেলেন।
জানেন লাইব্রেরিটা কেমন একলা হয়ে গেছে, দর্জায় চাবিতে ধূলো জমেছে, কতো মানুষ আফসোস করছে, বই পড়তে না পেরে।
তিনি ছাড়া সবকিছুই কেমন বেমানান। দুপুরের আড্ডা গুলো ফিকে হয়ে যায়, লাইব্রেরিটা বড়ো একলা। তপন কুমার গুড়িয়া আমার প্রথম লাইব্রেরিয়ান।
#laibrery #Pollivharotilaibrery #Bagnan #TapanGuriya
0 Comments