ছেলেবেলার ভাসান টা ছিলো অসম্ভব আদুরে ও জলকেলি তে ভরপুর। বিজয়াদশমী দিন বাড়ি বাড়ি প্রনাম করে কার কটা নাড়ু হলো সে নিয়ে যেমন একটা চাপানউতোর থাকতো, তার সাথে সাথে পুকুর ঘাটে স্নান করতে নেমে গত রাতের বিসর্জন হয়ে যাওয়া ঠাকুরের গয়না নিয়ে কাড়াকাড়ির উত্তেজনাও কম ছিলোনা। সকাল থেকেই জলে নেমে পড়তো পাড়ার দুরন্ত ছোকরারা।
গোটা পুকুর ঘাট তখন পাঁক ঘোলা অবস্থা। মা কাকিমা রা বাসন ধুতে নামলেই চিৎকার জুড়ে দিতেন, তোরা কি করছিস টা কি, আমরা কি কাজ করতেও পারবোনা, তোদের এই অত্যাচার নেওয়া যাচ্ছেনা, এইসব। যদিও আমরা সে সব পাত্তা দিতাম না বিশেষ।
চুপচুপে করে সর্ষের তেল গায়ে মেখে একে একে গামছা পরে নেমে পড়তাম জলে...তারপর শুরু হতো খোঁজ! কে কটা গয়না পেয়েছে, রাতে ঠাকুর ভাসান হয়ে গেলে পর মাটি রঙ সব গলে গিয়ে দুগ্গি বুড়ির কেমন একটা ঘোলাটে রুপ তৈরি হতো, আর একটা অদ্ভুত গন্ধ বেরোতো জলে ভিজে যাওয়া ঠাকুরের খড়ের অবয়ব থেকে। আমরা সে গন্ধ কেমন নেশার মতো মেখে নিতাম। তারপর টুপ করে ডুব মেরে গয়না খুঁজতাম, গয়না জোগাড় হয়ে গেলে আবার পরের মেড়ে ডুবে-ডুবে সাওয়ার হতাম৷ তারপর গামছায় বেঁধে নিয়ে প্রায় ঘন্টাখানেকের কসরত সেরে আড়ায় উঠে আসতাম।
পরে নানা রকুম বকাঝকা সামলে নিজেদের মতো করে মাটির ঠাকুর বানাতাম। কিছু গয়না, শোলার মালা সেই হাতেগড়া ঠাকুর কে পরাতাম। আর কিছু নিজেরা পরে ঠাকুর সাজা খেলতাম। সন্ধে বেলা সুরু হতো সেই ঠাকুর ভাসান এর মুহুর্ত! সকলে টিনের ড্রাম বাজিয়ে, থালা বাজিয়ে, ধূপ বাতি জ্বালিয়ে ঠাকুর ভাসান দিতাম। তখন আরো বেশি বেশি মনখারাপ করতো, কি একটা যেন চলে যাচ্ছে, কতো আনন্দ যেন চুপ করে যাবে আবার কিছু দিন। জীবনে হয়তো আনন্দটাই সব কিছু সেদিন বুঝে ছিলাম। আর দেবী কে কানে কানে জানতে চাইতাম কি গো পৌঁছে গেলে?
[6:16 PM, 11/1/2020] সৌম্য সুজন

0 Comments