||সবার কিছু দুঃখ আছে, ব্যক্তিগত দুঃখ আছে
©সৌম্য সুজন | ফোনের ওপারে নিমাই ভট্টাচার্য
| রিসিভ করে বললেন...হ্যালো...
একদিন তুমুল ঝড়বৃষ্টি বিকেল নাগাদ, এলোপাতাড়ি হাওয়ায় আমার ছাতা উল্টে ডিশ অ্যন্টেনা হবার উপক্রম। কলেজ থেকে ফিরে কোনো রকুমে সাইকেল টা নিয়ে দৌড় লাইব্রেরির দিকে...
সেখানে অন্ধকার, সেখানে মেঘ, সেখানে একঝাঁক বই হৈচৈ, সেখানেই প্রথম হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া.....হলুদ হয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা কৈশরের "মেমসাহেব"।
এইতো কিছু বছর আগেই ঘটে যাওয়া সে সব সোনাঝরা সময়। তখন নিজের হাত খরচ চালানোর জন্য টুকটাক টিউশন করি। সাইকেল আমার সে সব দিনের সফর সঙ্গী, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে আবার ফিরে আসার সময় অব্দি সে আমার চরণবাবুর ট্যাক্সি। এমন সব বিকেল তখন কাটতো লাইব্রেরি তে। একলাই ঘুরে বেড়াতাম বই ঘেষে করিডোরে।
আমাদের লাইব্রেরি টি ছিলো প্রায় ১২৫ বছরের পুরোনো। এখনো রয়েছে সে আগের মতোই। তবে লাইব্রেরিয়ান নতুন করে আর নিয়োগ হয়নি। যাই হোক ফিরে আসি ঘটনায়...
তখন প্রতিদিনই নিয়ম করে পড়ছি.. কিশোর সমগ্র, সত্যজিৎ, বুদ্ধদেব গুহ, দেশ, রোব্বার, আনন্দলোক, বিভূতিভূষণ, দেবেশ রায়, শম্কর, মনীষ গুপ্ত, শক্তি, সুনীল ইত্যাদি। এমনি এক দিনে একটি মাঝ বৈসি কিশোরী এসে দাঁড়ালেন আমারই সামনে,, আমি ক্যটালগ দেখে খুঁজে চলেছি নতুন কি পড়া যায়, লাইব্রেরিয়ান আামকে সাজেস্ট করে যাচ্ছেন একের পর এক বই, কিন্তু তবুও আমি আামার মতো করে খুঁজেচলেছি। না কিছু পেলে অগত্যা একটা কিছু নিয়ে রাত ৮ টা বাজার আগে রওনা হতে হবে, হঠাৎ সে কন্যে বলে উঠলেন...
- কাকু মেমসাহেব আছে?
- দেখো ক্যটালগ, পেতে পারো, গত দু সপ্তাহ কেউ এই বইটির খোঁজ করেনি।
মেয়েটি আপন মমে দেখতে লাগলেন ক্যটালগ,, অনেক ধৈর্য ধরে তাকে খুঁজতে দেখে আমি তো অবাক! কি আছে এই বইতে যার জন্য এতো সব বই ছেড়ে ওই একটি বই কেই খুঁজে চলা অনবরত!
সেদিন কন্যে বইটি হাতে পেয়ে তবেই মৃদু হেঁসে, ওফ্ পেলাম শেষ অব্দি বলে মিষ্টি কিছু গন্ধ হাওয়ায় মিশিয়ে বিদায় নিয়ে ছিলেন।
আমি অবাক হয়েছিলাম তার ওই একটি বই পাওয়ার নেশা কতো জোরালো সেই তুমুল ঠায় দাঁড়িয়ে ক্যটালগ ঘেঁটে চলা দেখে।
মাথায় নানা প্রশ্ন জেগেছিল কৈশরে পা দেওয়া কলেজ বেলার এক প্রেমিকের মনে। কি আছে তাতে। সেদিন বাবলি নিয়ে ফিরেছিলাম। পড়তে পড়তে প্রায় দু পেকেট বিড়ি শেষ, সারারাত বৃষ্টি। লোডশেডিং আর মশার কামড়ে বিদ্ধস্ত সারা গা, তবুও নেশা লেগে গেলো। সারা রাত কাবার করেদিলাম বইটি শেষ করতে। আর অপেক্ষায় রইলাম মেমসাহেবের,
বিকেল হতেই তড়িঘড়ি ফের দৌড় লাইব্রেরি তে, এখন আপনি ভাবছেন মেমসাহেব কি এলো মেমসাহেব ফেরত দিতে?? তাহলে ঠিক ভাবছেন, মেয়েটা কিন্তু সত্যিই মিষ্টি দেখতে ছিলো। চোখ লেগে গেলে সরার উপায় নেই। তার নেশাও আমাকে সেদিন লাইব্রেরি মুখো করেছিলো।
একনিশ্বাসে লাইব্রেরিতে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে কাকু কে গিয়ে বললাম,
-মেমসাহেব এসেছে?
-কে?
-মেমসাহেব?
- তুই বোস এখানে। একটু জল খা, আমার হাতে একটু কাজ আছে শেষ করে বলছি।
আমি হাতের কাছে থাকা বেশ পুরোনো একটা ম্যগাজিন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম, আর ভাবতে লাগলাম আকাশ কুসুম, যদি মেমসাহেব আজ আসে... তাহলে আরো একপশলা বৃষ্টি আর নরুম রাঙা পলাশের গন্ধে ভরে যাবে এই বইপাড়া, আহা সময় আর কতক্ষণ, কাকু একটু কাশলেন, আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম, সময় বয়ে চলেছে, এক নিস্তব্ধ মহনা দেয়াল ঘড়ির শব্দ বেজে চলেছে অনবরত, ভালো কিছুই লাগছে না৷ মন খালি খালি প্রশ্ন করে বসছে কই এলো কি? মেমসাহেব!! হঠাৎ টেবিলে চোখ গেলো, কাকু একটা বহু চেনা বই টেবিলের উপরে রেখেছেন...মনটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো, আর কাকু চশমার ফাঁকদিয়ে ব্যঙ্গাত্বক সুরে আমাকে খিল্লি করেদিলেন। মেমসাহেব কে পেলাম, কিন্তু মেমসাহেব কে পেলাম না।
বইটি হাতে নিয়ে বেশ কয়েক বার চোখ মেলালাম, নাকের কাছে এসে ঘ্রাণ নিলাম যদি সেই গন্ধটি পাওয়া যায়, একটা ক্ষীণ গন্ধ এলো বটে কিন্তু.....
বাড়ি ফিরে এসে বইটি পড়ার আগে একটা চিঠি লিখলাম সে চিঠি আমার মতো আরো হয়তো কতো প্রেমিক পাঠক লুকিয়ে রেখেছে কৈশোর পেরোনো লাইব্রেরির আনাচে কানাচে...প্রিয় বই এর পাতার ভাঁজে।
দু-বছর আগে বিকেল নাগাদই লাইব্রেরি তে আসি নিছক ইমোশন কুড়োতে, তখন আমি আর ছাত্র নোই, একটি কর্পোরেটের কর্মচারী৷ বিড়ি সাথে সিগারেটও জুটেযায় অহরহ,
সেদিনও একটি ম্যগাজিন হাতে এলো এবং আকস্মিক ভবে শ্রী নিমাই ভট্টাচার্য মহাশয়ের টেলিফোন নম্বর পেলাম।
কিচ্ছুটি কাউকে না জানিয়ে নম্বর টি আমার কি প্যড ফোনে ডায়াল করলাম। তারপর একটু বাইরে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে কলিং বোতাম টি টিপেদিলাম৷ ফোন ছুটলো তিনটি বিপ.... দিতে দিতে মেমসাহেব এর মালিকের ঠিকানায়... খড়মড় শব্দে মফস্বলি সন্ধ্যে টা হৈহৈ করে উঠলো, বুঝলাম তিনিই আছেন ও প্রান্তে.... আর রিসিভারটিও বোধহয় তাঁরই মতোই ওল্ড ইজ গোল্ড টাইপ,
ফোনের ওপ্রান্ত থেকে শব্দ এলো....
-হ্যালো,
-হ্যা, নিমাই বাবু বলছেন?
-বলছি, বলুন, আপনি কে বলছেন?
- তার পর তিনি অনেক কথা বলেগেলেন, হাতে একটু সমস্যা লিখতে গেলে টান পড়ে, তবুও চেষ্টা করি, আপনি নতুন সময়ের পাঠক, এখনো এ অধোম কে মনে রাখছেন শুনে কি যে আনন্দ পেলুম,,
- ফোনটা কখন কেটে গেছে টের পাইনি, রিং ব্যক করার ও সাহস হয়নি, কিন্তু অবচেতন মন তখনো ৫ বছর আগের সেই বৃষ্টিদিনের মেমসাহেব আর তার নরম রঙ পলাশের স্নিগ্ধ গন্ধের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে মেমসাহেবের মালিক কে....
ভালো থাকবেন আপনি! নিমাই বাবু। ভালো থাকুক আপনার হলদে হয়ে যাওয়া গোধূলি রঙা "মেমসাহেব"
.............©সৌম্য সুজন

0 Comments