বৃষ্টি বললো চুপ
সাকিবুল হাসান ছয় মেরেছে। অদ্ভুত খেলে ছেলেটা। ম্যচ জমেগেছে। কি হবে বাংলাদেশ কি জিতছে আজ! বৃষ্টি নামলো অঝরে, বুড়ো বটগাছটার গায়ে লেগে থাকা হোডিং এ হাসি হাসি মুখের টপার হওয়া ছেলেটার মুখটা তোবড়ে গেলো দমকা হাওয়ায়। কি অদ্ভুত ওয়েদার। মা ডাকদিলো বেশ কয়েকবার আমি হাঁ করে তাকিয়ে স্ক্রিনে পরের বলটা কি ছয় হবে?? বাবা দালানে বসে চশমা চোখে মন দিয়েছেন আজকাল এ। অবশেষে মা আমার সামনের ট্যবিলে সশব্দে রেখেগেলেন লুচি আর ছোটো আলুর তরকারি। আমি আর একটু রাগিয়ে দিতে একটু মুচকি হেসে বললাম এক কাপ চা হলে.... সাথে সাথে রান্নাঘর থেকে কড়া ভৈরবী রাগ বেজে উঠলো। পারবো না!!
সাকিবুল খেলছেন৷ তুমুল মেজাজ। যতবার ওঁর খেলা দেখেছি মুগ্ধ হয়েছি। পাশের দেরাজের উপর মাসিমণী বসে ফুল গাঁথছে, বেলফুলের মালা। আর দুলেদুলে গান গাইছেন "এমনো দিনে তারে বলাযায়। এমনো ঘনোঘোর বর্ষায়" বেশ সুন্দর গলা। টেবিলের উপর সুনীল গাঙ্গুলীর প্রথম আলো খোলা আছে যতটুক পড়া গেছে তারপরের অংশে একটা নীল পালক দেওয়া সেই পালক ঢেকে দিয়ে আরো কিছু পাতা ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে একত্রিশ, বত্রিশ, তেত্রিশ এভাবে....।
আমাদের শ্যওড়া পুকুরের ধার, মল্লিক দের সবেদা তলা, খেঁতু ডাক্তার দের মাঠ ভিজে যাচ্ছে দলাপাকানো বৃষ্টিতে...আর ভিজছে রাই দের জানলা। যেখানে মেয়েটা অনবরত লিপস্টিক লাগায় ঠোঁটে.….. আমরা ওদের বাড়ির নিচেই খেলতাম উবুদশকুড়িতিরিশ, খৈচুবাচুর, কুমির ডাঙা, চিনি বিস্কুট আর বিকেলে ইঁটদিয়ে উইকেট বানিয়ে গোলি ক্রিকেট। মেয়েটা তাকিয়ে থাকতো।
এমন বৃষ্টিতেও স্বপন বল করতো আর আমি একের পর এক ছয় হাঁকাতাম। টুপি ঘুরিয়ে সে কি কেতা। একটু বৃষ্টি কমলে বাসন ওয়ালা সাইকেল রিক্স নিয়ে বেরিয়ে পড়তো ঢংঢং কাঁসরের আওয়াজ তুলে। পাড়ার মা ঠাকুমা সকলে একে একে বেরিয়ে এসে ভিড় জমাতো ঝাঁকির চারপাশে।
একবার তুমুল বন্যা। অবস্থা খুবই জোটিল। লোকের গোরু ছাগল ভেসে বেড়াচ্ছে বাঁধভাঙা জলে.... পাতর দের দাওয়ায় উঠেছে বেশ কিছু মানুষ আর বাকি লোকজন রায় পাড়ার দিকে গেছে। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে! হেলিকপ্টার নাকি খাবার দিয়ে যায়। সে কি মজা;
আমিও কম মজাটাই না করিনি৷ সব শেষে হেলিকপ্টার আর এলোনা বাবা ডোঙা নিয়ে বাজার থেকে বাজার নিয়ে ফিরলেন। সঙ্গে মাসির জন্যে ১০ খিলি সাজা পান।
এখন বৃষ্টি থেমে গেছে। মা সেই একই রকুম গনগনে কয়লার আঁচ। মাসির দুই কুড়ি মালা গাঁথা হয়েছে।
আমি সুদূর অতীতে চশমা রেখে হাঘরে হয়ে খুঁজে মরছি পুতুল মাসির দুপুরের কয়েত বেল মাখা। মায়ের হাতে তৈরি ছোটোআলুর তরকারি আর লুচি...রোব্বারের অনুরোধের গান, আর ছয় মারার পর রাই'দের বাড়ির ছাত থেকে সোঁ করে উড়ে যাওয়া বলটাকে...!
সাকিবুল দারুণ খেললো আজ। বৃষ্টিও অদ্ভুত ঝরেগেলো সারাদিন। ঘুমের মধ্যেও এলোমেলো করেদিলো বর্ষা দিন।
প্রথম আলো তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে... আর আমিও খুব ভারী হয়ে আসা চোখে চোখে তাকিয়ে রইলাম...
©সৌম্যসুজন
![]() |

0 Comments